ভয় আর রোমাঞ্চের ককটেল

ঘুরে আসি জীবনতরী

আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়! আরেকটু হলেই যেতো। কেউ না কেউ বাঘের পাতে সার্ভ হয়ে যেতাম।

যেখানটায় থেমে ছিলাম তার থেকে খানিকটা সরে গিয়ে মাঝি বলছে, এবার পেছনে তাকান। কৌতুহলী নজর পেছন ফিরতেই চোখ ছানাবড়া। নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। দ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার। গায়ে যেন কাটা লাগলো। এ এক অপূর্ব শিহরণ। ভয় আর রোমাঞ্চের ককটেল।

অ্যাডভেঞ্চারের ঘোরে একাই বেরিয়েছি। প্য‍াকেজ ট্যুরের নিরাপদ ঘেরাটোপ নেই। অবশ্য, বন্ধু-আত্মীয়রা বার বার বলায় কলকাতার অপারেটরদের কয়েকটা অফিসে ঢুঁ দিয়েছেলাম। ঠিক পোষায়নি। তাছাড়া বাঁধাধরা গন্ডির বাইরে অ্যাডভেঞ্চার নাকি নতুন মাত্রা পায়! তাই নিয়মে বাঁধা পড়লাম না। গুগলের ভার্চু্‌য়াল জগতে সুন্দরবন হাতের মুঠোয়। অন্তর্জাল ঘেঁটে পেলাম অনেক তথ্য। বেছে নিলাম রুট। শিয়ালদা থেকে ট্রেনে ক্যানিং। সেখান থেকে আধ খোলা ছেট ম্যাজিক বয়ে নিয়ে চলল শরীরটাকে। গন্তব্য ঝড়খালি। সুন্দরবনের সীমানায়।

মাথা গোঁজার জায়গাটা আগে ঠিক করে নিলাম। হোটেল খুঁজে পেতে সমস্যা হয়নি।

হাজার টাকার মধ্যে ভাল রুম মেলে। এসি না থাকলেও অসুবিধা নেই। শুধু জানালা খুলে বঙ্গোপসাগরের হাওয়াকে জায়গা দিন। পিট্টু-টা রুমে রেখে বেরিয়ে গেলাম জেটির দিকে। পথে বাজার, লোকজন, কৃষি জমি সবেতেই গ্রাম বাংলার বইয়ে পড়া ছবি। বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণ যুগের লেখক-কবিদের সৃষ্টিতে যেমন ধরা ছিল, তার থেকে খুব একটা বদলায়নি। নতুন বলতে কিছু উপকরণ জুড়েছে। এই প্রান্তের মানুষ এখনও প্রকৃতির সাথে লড়ে চলেছেন। যদিওবা কারও কোমড় সোজা হল তো সাইক্লোন তা ভেঙ্গে দেয়। আবার সোজা হয়ে দাঁড়াবার কসরৎ শুরু। প্রকৃতির ছন্দে বাঁচাই রেওয়াজ। বিদ্যাধরী নদীতে ভেসে গেলেই হল। অল্প সময়ের মধ্যে মোহনা। নদীর এক ধারে ঝড়খালি। অপর তীরে শুরু সুন্দরবন। গুগল ম্যাপে পার্থক্যটা দারুণ বোঝা যায়। নদীর পূব দিক থেকে মানচিত্রে যতই এগোবেন, সবুজ ততই গাঢ় হতে থাকে।

ভুবন বিখ্যাত গাঙ্গেয় ডেলটা। ছড়িয়ে রয়েছে দুই দেশে। ভারত ও বাংলাদেশে। ভারতের অংশ ৪০ শতাংশ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। দ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ঘর। যার সামনে পড়ার দুঃসাহসের জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে।

নদী-সমুদ্র, মাছ আর পর্যটন—সুন্দরবনের আশপাআ গ্রামের জীবিকার প্রধান স্রোত। চাষ, ব্যবসাও আছে অল্প বিস্তর। পর্যটকদের আপ্যায়ন করতে জানেন এখানকার মানুষ। জেটিতে তেমনটাই পেলাম। একা বোট ভাড়া করতে খরচ অনেকটা বেশি। অন্যদের সাথে শেয়ার করেই যান বেশিরভাগ মানুষ। তেমন কিছু পাচ্ছিলাম না। নিরাশ হতে দেখে একজন ফোন নম্বরটা রাখলেন। আশ্বাস নিয়ে ফিরলাম হোটেলে। ঘন্ট দুই পর ফোন সেই ব্যক্তির। ব্যবস্থা হয়ে গেছে। পরদিন সকাল ৮টায় রওয়ানা।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল। প্রাতঃকর্ম সেরে বেলকনিতে বসে আছি। পূবের দিকে চেয়ে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। কখনও মৃদু-মন্দ, কখনও মধ্যম গতিতে। আলো যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে সুন্দরবনের মায়াবী ছবি। সবুজের গলিচার আরেক প্রান্ত থেকে উঁকি দিচ্ছেন আংশুমান। সকালের চা, প্রাতরাশ ব্যালকনিতেই। সকাল সকালই হাজির জেটিতে। বোটগুলো নদীর ঢেউয়ে দুলছে। আমার মনের দোলার সাথে তার মিল খুঁজতে বসলাম। কখন থেকে যে বোট অপারেটর ডাকছে, সেদিকে খেয়াল ছিল না। হয়তো তিনিও বুঝতে পারলেন। কাছে এসে গায়ে টোকা দিলেন। সম্বিত ফিরল। একটা বোট তৈরি। চার-পাঁচ জন যুবক সওয়ার। সবাই আমার অপেক্ষায়। একটা হালকা হাসিতে হায়-হ্যালো হল। আর দেরি করা যায় না। চাপলাম বোটে। বোটের দোলায় শরীরটা ব্যালেন্স করতে হল। রোমাঞ্চ তখন শিখরে।

যাত্রা শুরু করল স্পীড বোট। প্রথম ডেস্টিনেশন দোবাকি। ঝড়খালির উল্টো পাড়ে। বিদ্যাধরীর ঢেউ ছলাৎ ছলাৎ ধাক্কা খাচ্ছে বোটে। বাতাসে টুপিটা উড়েই যাচ্ছিল। ভাগ্যিস ধরে ফেলেছি। দেবাকি থেকে ওয়াইল্ড লাইফ পার্কে। সেখানে কুমিড় আর হরিণের ছড়াছড়ি। বোট সেখান থেকে ঘুরে চলল মোহনার দিকে। বিদ্যাধরীর ঘোলা জল হঠাৎ হারিয়ে গেছে সেখানে। নীলের প্রান্ত সীমা বেশ স্পষ্ট।

সাগর থেকে বোট বোঝাই মাছ ধরে ফিরছিল জেলেরা। কিনে নিলাম খানিকটা। শহরের অফিসবাবুরা যেমন টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ছোটেন, এখানকার মাঝিরা চলেন রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে। গরম গরম মাছ ভাজা, মাছের পেঁয়াজি নামতে বেশি সময় নেয়নি। সহযাত্রী যুবকদের ব্যাগপ্যাক থেকে বিয়ারের ক্যান বেরুল। আগের রাতেই তাদের সাথে পরিচয়। তারাও বোট পায়নি প্রথমটায়। একই হোটেলে ছিলাম। সবাই পেশাজীবী। তাদের জন্যও রিফ্রেশ ট্রিপ। বয়স ত্রিশের কিছু কম বেশি হবে। বয়সে বছর দশেকের ফারাক বন্ধুত্বের অন্তরায় হয়নি। বেশ  জমে গেল তাদের সাথে।

প্যাকেজ ট্যুরে শাখা-উপশাখাগুলোয় ঢোকার সুযোগ নেই বললেই চলে। এখানে আমাদের এডভান্টেজ। একদল যুবক সুন্দরবনের খারিতে ঢুকতে মুখিয়ে আছে। প্রবল অনুরোধে মাঝিও রাজি। তবে জল শুকোবার আগে ফিরতে হবে। নইলে ইতি টেনে দেবে দ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বোট ঢুকে পড়ল একটায়। ত্রিপুরার পাহাড়ী নদীগুলো বর্ষায় যে আকার নেয় অনেকটা তেমন। দু’ধারে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ডাঙ্গায় বাঘ তো জলে কুমির। গুগল ম্যাপে দেখলে সবুজের বুকে আঁকাবাঁকা রেখার মতো চলে গেছে শাখাগুলো। মাঝি আর তার সহকারি সতর্ক। তাদের চোখ ডাঙ্গায় বেশি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার নাকি একবার পিছু নিলে রেহাই দুস্কর। বহু দূর পর্যন্ত নৌকার পিছু নেয়। সুযোই পেলে কখন কাছে চলে আসবে কে জানে। মাঝির কথায় গায়ে কাটা দেয়। লোকটা কি ভয় দেখাচ্ছে? এই তো খারিতেই কয়েকটা নৌকার দেখা মিলল। বিরাট চিংড়ি, পেল্লাই সাইজের কাকড়া নিয়ে ফিরছে। দেশের বাজারে এগুলোর দর্শন মিলে না। চলে যায় দেশ-বিদেশের পাঁচ-সাততারা হোটেলে।না, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খাসতালুকে এসে বাহাদুরি দেখানোও বেদ্ধিমানের কাজ নয়। হরিণ, কুমির অনেক চোখে পড়ে। বাঘ সহজে পড়ে না।

ভাটা শুরু হয়েছে। জল নামছে। ফেরার তাড়া দিচ্ছে মাঝি। কারণ জল থাকতে না বেরুলে এখানেই আটকা পড়তে হবে। বাঘও তক্কেতক্কে থাকে। মুখে তার কথা নেই। চোখ ছলছল। কি হল বোঝা যাচ্ছিল না। সহকারি বললেন, যেখানটায় আমাদের বোট থেমেছিল, সেখান থেকেই মাঝির পরিবারের এক সদস্যকে বাঘে নিয়ে গেছে। ঘটনার বছর ঘুরেছে। বোটের একধারে বাঘের নখের আঁচর দেখিয়ে বললেন, ঐদিক দিয়ে উঠেছিল। বোটের যাত্রীদের নীরব দৃষ্টি একে অপরের দিকে ঘুরছে……।

তখনই মাঝি বোট চালিয়ে দিল। খানিক সরে গিয়ে পেছনের দিকে ইশারা। দেখি ম্যানগ্রোভের জঙ্গল থেকে চেয়ে আছে ডোরাকাটা। মেরুদণ্ড বেয়ে একটা বরফ স্রোত নামলো।

2 thoughts on “ভয় আর রোমাঞ্চের ককটেল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *