মিউজিক থেরাপি

জীবনতরী ভালো থেকো

আমাদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই আমাদের অনুভূতির প্রত্যেকটি তন্তুর সাথে জড়িয়ে আছে মিউজিক বা সঙ্গীত। ভালো সুর মনকে আনন্দ দেয়, সুরের জাদুতে মন ভরে উঠে প্রশান্তিতে। আবার যখন সুর শূণ্যতা সৃষ্টি করে, অজান্তেই নেমে আসে জলের ধারা চোখের কোণ বেয়ে। আবার অনেক সময়  সুরের উদ্দামতায় শরীর টগবগ করে ফুটতে থাকে। এসব কিছুই কোন না কোনও ভাবে আমাদের সবার সাথেই ঘটে। কিন্তু এর মানে বা কারণ আমরা জানিনা অথবা সেরকম ভাবে জানার চেষ্টাই করিনি কখনও। খুবি সাধারণ দৈনন্দিন ব্যাপার মনে করি বিষয়টাকে। সঙ্গীতের উপর বর্ণিত শক্তি বা চরিত্রের সুষম ও সঠিক ব্যবহারই হচ্ছে মিউজিক থেরাপি।

মিউজিক থেরাপি নতুন কোনও চিকিৎসা পদ্ধতি নয়। এর ব্যবহার বহু প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। তবে এর স্বরূপের পরিবর্তন হয়েছে সময় থেকে সময়ান্তরে। বিখ্যাত দার্শনিক যেমন অ্যারিস্টটল, পিথাগোরাস, ডেমোক্রিটাসের লেখায় মিউজিক থেরাপির উল্লেখ পাওয়া যায়। তারা মানুষের স্বাস্থ্যের উপর সঙ্গীতের ভালো এবং মন্দ প্রভাব উভয়ই বর্ণনা ককরে গেছেন। দার্শনিক প্লেটো তৎকালীণ সময়ে কিছু সুর ও গানকে বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই গানগুলি মানুষের মনে কুপ্রভাব (উনি বর্ণনা করেছেন সুরগুলির মানুষের সামাজিক ও চারিত্রিক অবক্ষয় ঘটানোর ক্ষমতা ছিল) তৈরি করছিল।

তবে আধুনিক মিউজিক থেরাপির সূত্রপাত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে। বলা যায় অনেকটা আকস্মিক ভাবেই। তখন যুদ্ধে আহত সৈনিকদের অস্রোপচারের পর দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার জন্য মাংসপেশির ব্যায়াম করানো হতো। এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আকর্ষণীয় এবং ছন্দবদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন সুর ও সঙ্গীতের ব্যবহার শুরু হয়। চিকিৎসক এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিক্যাল টিম লক্ষ্য করে যে সঙ্গীতের ব্যবহার করে যারা ব্যায়াম করছেন তারা অন্যদের চেয়ে অনেক দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। শুধু তাই নয়, যুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক আঘাত অতিদ্রুত কাটিয়ে উঠছেন। এই পর্যবেক্ষণ খুলে দেয় চিকিৎসার নতুন জানালা। তারপর থেকেই বিভিন্ন সেনা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা মাধ্যম হিসাবে সঙ্গীতের ব্যবহার শুরু হয় অনেকটা পরীক্ষামূলকভাবে। এর অভাবনীয় সাফল্যের  পরই আমেরিকাতে তখন শুরু হয় মিউজিক থেরাপির কোর্স। ব্যাপকভাবে এর প্রচার ও প্রসার চলতে থাকে। শুরু হয় পেশাদার মিউজিক থেরাপির পথচলা।

মিউজিক থেরাপির পেছনে বিজ্ঞান

যথোপযুক্ত সঙ্গীত বা সুর মানুষের শরীরে কিছু হরমোন যেমন- ডোপামিন এন্ডোরফিন্স-এর ক্ষরণ বাড়ায়। এগুলি শরীরের ফিলগুড রাসায়নিক নামে খ্যাত, যেগুলি মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে। তাছাড়া এন্ডোরফিন্স শারীরিক ব্যাথা প্রশমনেও কাজ করে।

‘ইমিউনোগ্লোবিউলিন-এ’ বহু ভাইরাস এবং অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণুর আক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করে। সঙ্গীত বা সুর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

করটিলস হচ্ছে স্ট্রেস হরমোন যা মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিসৃত হয়। উচ্চ গ্রাম এবং বেশি বি্টএর  মিউজিক  শরীরে করটিসলের মাত্রা বাড়ায়। ধীরলয়ের সুর, ভারতীয় রাগ সঙ্গীত করটিসলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। সাথে সাথে স্ট্রেসও কমায়। অর্থাৎ করটিসলের ক্ষরণ গান বা সুরের ফ্রিকোয়েন্সির উপর নির্ভর করে। সঙ্গীতের এই ব্যাপারটা অস্ত্রোপচারের আগে এবং পরে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি বা শব্দ কম্পাঙ্কের সুর ব্যবহার করে করটিসলের মাত্রা প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ কমানো যায়, যা বিভিন্ন সার্জারিতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে কার্ডিয়াক সার্জারিগুলিতে সঙ্গীতের ব্যবহার আজ বিশ্বব্যাপী।

যারা দীর্ঘদিন উচ্চগ্রামের দ্রুতলয়ের মিউজিক শোনেন তাদের আসক্তি বাড়ে শরীরের করটিসলের মাত্রা বেড়ে থাকার জন্য। উচ্চগ্রাম ও দ্রুতলয়ের সঙ্গীত নার্ভের রিজেনারেশন প্যাটার্ণ বা পুনরাবৃত্তি অস্বাভাবিক করে। যা অন্য নার্ভের সাথে সংযুক্তি কমিয়ে দেয় মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস নামক অংশে যেটা স্মৃতি এবং শিক্ষার সাথে যুক্ত। ফলে মস্তিষ্কের বিচার ক্ষমতা কমে যাওয়ার সাথে সাথে স্মৃতিধারণ ক্ষমতাও কমে যায়।

 

মিউজিক থেরাপির ব্যবহার

মিউজিক থেরাপির ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতির জন্য এর ব্যবহার সুন্দরভাবে সংক্ষেপে দেয়া হল:

সঙ্গীত অসুস্থ শরীর ও মনে প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠার শক্তি যোগায়। যেকোনও সুরের কম্পাঙ্ক ৫০০০-৮০০০ হার্জের মধ্যে হলে সেটা মস্তিষ্কের আলফা ব্যান্ড ব্রেইনওয়েভস-এর গতি তরান্বিত করে। তারযন্ত্রের সুর যেমন ভায়েলিন, ভায়োলা, চেলো মন ও মাংসপেশিকে বিশ্রাম দেয়।

ডিপ্রেশন ও নানা মানসিক রোগের ক্ষেত্রে সুর-এর ব্যবহার আজ বিশ্বব্যাপী। বিভিন্ন কম্পাঙ্কের সুর শরীরের বিভিন্ন অংশে কাজ করে। সেই অনুযায়ী ঐ সুরগুলো রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়।

নবজাতক থেকে বৃদ্ধাবস্থা, জীবনের প্রত্যেকটি মুহূর্তে সঙ্গীত এক অনন্য সাধারণ ভূমিকা নেয় মানুষের শরীর ও মনের বিকাশের জন্যে।

বর্তমান অস্থির সহনশীলতাহীন সামাজিক পরিস্থিতি থেকে হয়তো সবার উত্তরণ ঘটবে সঙ্গীতের হাত ধরেই। আশা রাখি ‘গানওয়ালা’ কবির সুমনের সুরেই—

“গান তুমি হও গরমকালে সন্ধ্যেবেলার হাওয়া

অনেক পুড়ে যাবার পরে খানিক বেঁচে খাওয়া….”

 

  • উচ্চ কম্পাঙ্কের সুর মস্তিষ্কে ক্রিয়া করে।
  • নিম্ন কম্পাঙ্কের সুর মেরুদণ্ডের নিম্নাঞ্চল এবং পেটের নীচের অংশে কাজ করে।
  • মধ্য কম্পাঙ্কের সুর গলা ও বক্ষপিঞ্জরে কাজ করে। যে কোনও বাদ্যযন্ত্রের সুরই তার কম্পাঙ্ক, সুরের তারতম্য, লয়, সৌন্দর্যের দ্বারা মানুষের শরীরকে প্রভাবিত করতে পারে।
  • যে কোনও সুর যদি ৬০ বিটস্ প্রতি মিনিট-এর কাছাকাছি হয় (সুরের লয়) তার প্রভাব শরীরে সবচেয়ে বেশি।
  • যো কোনও অসুস্থতায় সহযোগী চিকিৎসা হিসাবে মিউজিক থেরাপি ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন ও বডিমেটাবলিজমের উপর কার্যকারিতার জন্য।
  • বিভিন্ন সার্জারির আগে এবং পরে রক্তের কর্টিসল লেভেল (স্ট্রেস হরমোন) নিয়ন্ত্রণের জন্য মিউজিক থেরাপি বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • মুভমেন্ট ডিসঅর্ডার যেমন পারকিনসনিজম এবং স্ট্রোকে রিদমিক মিউজিক ব্যবহার করা হয় রোগীর নার্ভের ‘মোটর মুভমেন্ট’ ঠিক করার জন্য।
  • প্রশান্তিদায়ক মিউজিক ব্যবহার করা হয় কেমোথেরাপি এবং লেবার রুমে ব্যাথা প্রশমনের জন্য।
  • অটিস্টিক বাচ্চাদের স্কীল ডেভলাপমেন্ট এবল পারিপার্শ্বিকের সাথে তাদের যোগাযোগ বাড়াবার জন্য মিউজিক থেরাপি ব্যবহার হয়।
  • শুধু সুর বা সঙ্গীত শোনা নয়। বাদ্যযন্ত্রে সুর সৃষ্টি করাও মিউজিক থেরাপির অঙ্গ। অ্যালজাইমার্স ডিজিজে এবং পারকিনসনিজমের রোগীদের ড্রাম জাতীয় তালবাদ্য বাজাতে দেওয়া হয়। তাদের নার্ভ কো-অর্ডিনেশন ও মোটর মুভমেন্ট উন্নতির জন্য। শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের হারমোনিয়াম বাজাতে দেওয়া হয় ফুসফুসের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশীর শক্তি বৃদ্ধির জন্য।

By-ডা মণিদীপ চক্রবর্তী (মিউজিসিয়ান ও ফিজিসিয়ান)

1 thought on “মিউজিক থেরাপি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *