রত্ন সম্পর্কে জানুন

আধ্যাত্ম গ্রহ-নক্ষত্র

রত্ন সম্বন্ধে নানা তথ্য:

বহুকাল আগের থেকেই ধনবান এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা রত্ন ব্যবহার করতো।সমাজে মর্যাদা এবং প্রতিপত্তি প্রকাশ করার জন্য রত্ন একটি বিশেষ ভূমিকা নিত।এইজন্যই রাজ-রাজাদের মুকুটে,বেশভূষায় রত্ন ব্যবহার করা হতো।তাছাড়া,রত্ন দেখতে এত আকর্ষণীয় হয়,যে কোনো সৌখিন ব্যক্তি রত্নকে নিজের কাছে রাখতে পছন্দ করে।

আদিম যুগে যখন মানুষ সবেমাত্র সভ্য হয়েছে তখনও এই রত্ন তাদের বিশেষ আকর্ষণ করতো এবং এই রত্নগুলি নিয়ে তাদের বিশেষ উৎসাহ ছিল।যুগের তালে তালে মানুষের কাছে রত্ন খুবই মূল্যবান হতে লাগলো।তার কারণ হল এই রত্ন খুবই কম সংখ্যায় পাওয়া যায়।রত্নের কাঠিন্য,উজ্জ্বলতা,রং ও তার স্হায়িত্ব রত্নকে মূল্যবান করে তোলে।বর্তমান যুগেও কিন্তু রত্নের কদর খুব বেশি।সংবাদপত্র,টিভি চ্যানেলে মাঝে মাঝেই খবরের শিরোনামে উঠে আসে বহু কোটি টাকায়,নিলামের মাধ্যমে রত্ন বিক্রি হয়েছে।সেটা হীরা হতে পারে,সেটা চুনী বা নীলা বা অন্যান্য রত্নও হতে পারে।

বৈদিক যুগেও ভারতবর্ষে রত্নের যথেষ্ট কদর ছিল এবং রত্ন সম্বন্ধে তাদের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল।আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং নানা কিছু সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রত্নের যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল।অলঙ্কারের জন্যও কদর ছিল,তবে সেটা ছিল গৌণ।সে সময়ে বিশ্বাস ছিল রত্নের মাধ্যমে নানা শক্তি উৎপন্ন করে মানব জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করা যায়।সেইজন্য মন্দিরে নানা রত্ন রাখা হতো।তখন জ্যোতিষরা বিশ্বাস করতো রত্ন হল দৈব শক্তির ভাণ্ডার।এই সৌর জগতের যত গ্রহ আছে তাদের থেকে যে শক্তি এই পৃথিবীতে আসে সেই শক্তি রত্নের মধ্যে জমা হয়।সে জন্যই গ্রহের কু-দৃষ্টি থেকে মুক্তি পেতে বা তাদের সু-দৃষ্টি দিয়ে তাদের জীবন,সমাজে এবং শরীরের উন্নতি ঘটাতে এই রত্নের শক্তি সাহায্য করে।

তাছাড়া রত্ন যেহেতু দৈব শক্তির ভাণ্ডার সেইজন্য নানা পূজার জিনিষেও রত্ন ব্যবহার হতো।যাতে সহজেই ভগবানের কৃপা লাভ করা যায়।নানা অস্ত্রশস্ত্রে,অঙ্গে নানা রত্ন ধারণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে যেত,যাতে যুদ্ধে জয় লাভ করা যায়।নানা সিংহাসনেও নানা রত্ন ব্যবহার করা হতো।সবকিছুই করা হতো জ্যোতিষের পরামর্শে,জাতকের কুষ্ঠি বিচার করে।

কিভাবে রত্ন তৈরি হয়:

স্ফটিক তৈরি হতে প্রয়োজন হল—নানা উপকরণ তাপ,চাপ,সময় এবং জায়গা।নানা ধরনের খনিজ দ্রব্য স্ফটিকে পরিণত হয়।সেটা কি ধরনের স্ফটিক হবে তা নির্ভর করছে বিভিন্ন ধরনের তাপমাত্রার উপর।প্রথম Corundum তারপর আরও ঠান্ডা হলে সেটা টোপাজ তারপর কোয়ার্জ।শুধু প্রেসার বা চাপ খনিজ দ্রব্যে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।কিন্তু যদি তাপ এবং চাপের ঠিকঠাক সংযোগ ঘটে তবেই নানা খনিজ দ্রব্য স্ফটিকে পরিণত হয়।

তাপ ও চাপের ফলে খনিজ দ্রব্যগুলিতে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে তা স্ফটিকে পরিণত হতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন এবং অবশ্যই সেই স্ফটিক যাতে গড়ে উঠতে পারে তার জন্য চাই প্রয়োজনীয় জায়গা।

ভূমিকম্পের ফলে আমাদের পৃথিবী মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠে এবং এই কম্পনের ফলে নানা রকমের ছোট বড় গর্ত ও ফাটল তৈরি হয়।আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা বেরিয়ে নানাদিকে প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।ভূমিকম্পের ফলে যে গর্ত বা ফাটল তৈরি হয় সেখানে লাভা জমা হতে থাকে।যেহেতু মাঝে মাঝে পৃথিবী কেঁপে উঠে সেজন্য এই ফাঁক ও গর্তে খুব চাপ পড়ে।এই চাপের ফলে এবং ধীরে ধীরে সেই লাভা ঠান্ডা হওয়ার ফলে সেই ফাটলগুলিতে নানা স্ফটিক সৃষ্টি হয়।এইভাবেই ধীরে ধীরে নানা রত্নের সৃষ্টি হয়।

তাছাড়া আমাদের পৃথিবীর মাটির যত বেশি গভীরে যাওয়া যাবে ততই উত্তপ্ত থাকে।ভূমিকম্পের ফলে সেই উত্তাপে নানা খনিজ দ্রব্যের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তরল পদার্থের রূপ নেয়।এবং এই তরল পদার্থ নানা ফাঁক-ফোকরে ঢুকে পড়ে এবং সেই ফাঁক-ফোকরগুলি সংকুচিত ও প্রসারিত হওয়ায় খুব চাপের সৃষ্টি হয়।সময় বয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ঠান্ডা হতে থাকে এবং স্ফটিকে পরিণত হতে থাকে।এই স্ফটিক থেকেও নানা রত্ন পাওয়া যায়।

বৃষ্টির জলও স্ফটিক তৈরি করতে বিশেষ সাহায্য করে।এই পৃথিবীতে নানা ক্যামিকেল আছে।যখন বৃষ্টি হয় তখন সেই জলের সাথে নানা ক্যামিকেলের বিক্রিয়া ঘটে এবং জলের সাথে প্রবাহিত হয়ে নানা ফাঁক-ফোকরে ঢুকে পড়ে।আমাদের পৃথিবীর মাটির নীচে নানা স্তরে আছে সেই স্তরে ভাঙা-গড়ার ফলে খুব চাপ তৈরি হয়।সেইও ফাঁক-ফোকরে থাকা রাসায়নিক দ্রব্যগুলির উপর চাপ পড়ে এবং সময় বয়ে যাওয়ার সাথে স্ফটিকের আকার নিতে সাহায্য করে।এই স্ফটিক থেকেও রত্ন পাওয়া যায়।আমাদের পৃথিবীর মাটির নীচে নানা খনিজ দ্রব্য তরল অবস্হায় আছে এবং বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়।প্রচণ্ড চাপে আশেপাশে বা উপরে এবং নীচে থাকা খালি জায়গা সেই তরল পদার্থ দখল করে ধীরে ধীরে সেখানে জমাট বাঁধতে থাকে ও নানারকমের পাথরে পরিণত হয়।এই পাথর থেকেও রত্ন পাওয়া যায়।তাছাড়া অর্গানিক বা জৈব রত্নও আছে।যা জীব এবং উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়।যেমন প্রাকৃতিক মুক্তা ঝিনুকের মধ্যে হয়।বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে মুক্তার চাষ হয়।প্রবাল রত্ন সমুদ্রের নীচের উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়।প্রবাল নামক কীটের বর্জ্য দিয়ে হাজার বছর ধরে জমতে জমতে গাছের আকার ধারণ করে।

 রত্ন কিভাবে কাজ করে:

বর্তমানে আমরা জানি জীবনকে সুন্দর রাখতে রত্ন ধারণ করা হয়।কিন্তু অনেকেই কথাটা বিশ্বাস করে না।বিশেষ করে ইয়াং জেনারেশন।তারা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা চায় রত্ন কাজ করে কিনা?অনেক জ্যোতিষই এর ঠিকঠাক ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না।তবে যারা রেজাল্ট পেয়েছে তাদের বৈজ্ঞানিক কেন,কোনো ব্যাখ্যাই দিতে হয় না।

সত্যি বলতে কি বৈজ্ঞানিকভাবে রত্ন কাজ করে কিনা এটা প্রমাণ করা সম্ভব নয়।এমনকি যারা রেজাল্ট পেয়েছে তারাও প্রমাণ করতে পারবে না রত্ন কিভাবে কাজ করেছে।শুধুমাত্র তারা বলতে পারবে রত্নটা ধারণ করার পর তাদের কি কি উপকার হয়েছে।এটা একটি উপলব্ধি।সময়ের তালে তালে প্রকাশ পায়।দীর্ঘকাল ধরে রোগে ভুগছে এমন কোনো রোগীকে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ খাইয়ে চট করে বলে দেওয়া যাবে না রোগ ভালো হয়েছে কিনা?সময় বয়ে যাওয়ার সাথে ষাথে আমরা তা বুঝতে পারি সে আরোগ্য লাভ করেছে কিনা।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না দিতে পারলেও রত্ন কিভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করা সম্ভব।ভগবানের আশীর্বাদ পেয়েছি কিনা তা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়।কিন্তু উনার দয়ায় জীবনে কিভাবে পরিবর্তন এসেছে সেটা অবশ্যই ব্যাখ্যা করা যায়।অনেকেই বলবেন—গ্রহের আবার কি প্রভাব আছে এই পৃথিবীর মানুষের উপর?অবশ্যই আছে।অমাবশ্যা,পূর্ণিমাতে আমাদের শরীরে ব্যথা বেদনা হয় এটা আর কিছুই না।এটা হল আমাদের শরীরেপ চন্দ্রের প্রভাব।এই চন্দ্রের জন্যই তো জোয়ার-ভাটা হচ্ছে।এটা তো আমরা সবাই জানি।তবে নীলা রত্নের মাধ্যমে অনেকেই চটজলদি বলতে পারে রত্ন কাজ করে কিনা?একমাত্র এটাই এমন একটি রত্ন যার দ্বারা মানুষকে প্রমাণ দেওয়া যায়,রত্ন কাজ করে কিনা?এই নীলা রত্ন ধারণ করার আগে ন্যূনতম তিনদিন নিজের কাছে রেখে পরীক্ষা করতে হয় নীলাটি সুট করল কিনা।তারপরই ধারণ করতে বলা হয়।অনেক সময় নীলা সুট করে না,এটা ধারণের সঙ্গে সঙ্গে নানা দুঃস্বপ্ন,দুর্ঘটনা,অযথা হয়রানির শিকার হতে হয়।যদি সুট করে,যে কাজের জন্য নীলা ধারণ করা হয়েছে সে কাজে ভাল ফলদান করে।

ক্যাটসআইয়ের মাধ্যমেও অল্পকিছুদিনের মধ্যে ফল পওয়া যায়।তবে ক্যাটসআইটি অবশ্যই ভাল কোয়ালিটির ভাল পৈতাযুক্ত হতে হবে।ক্যাটসআই সুট না করলেও শরীরে বিশেষ অসুবিধার সৃষ্টি হয়।এমনকি জ্বর,শরীরে ব্যাথা বেদনা শুরু হয়—এর কারণ কি?গ্রহরা শরীরের একটা নির্দিষ্ট অংশে কাজ করে এবং শরীরের হরমোনের প্রভাবকেও নিয়ন্ত্রণ করে।হাতের প্রতিটি আঙুলের নীচে উঁচু,নীচু দেখা যায়।এগুলিকে জ্যোতিষিগণ নানা গ্রহের মাউন্ট বলে।আকুপ্রেসার ও সুজুক থেরাপির মাধ্যমে শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানাভাবে চিকিৎসা করে।রত্ন ধারণ করলেও  সেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি এবং মাউন্টগুলিকে মেসেজ করে একটা তরঙ্গ ও প্রেসার তৈরি করে,রত্ন শরীরে ভাল বা মন্দ রেজাল্ট প্রদান করে।

অনেক সময় দেখা যায় জাতক বা জাতিকা রত্নের আংটি ধারণ করার পর অসুস্হ বোধ করছে,এর কারণ গ্রহের কারকতাই নয়,এটা শরীরে রত্নের অপ্রয়োজনীয় প্রেসারের জন্য।প্রতিটি রত্নেরই একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন আছে।গ্রহের আংটি ধারণ করার সময় বলে দেওয়া হয় যাতে আংটির রত্নটি শরীরের সাথে স্পর্শ করে।এর পেছনে একটি কারণও আছে,রত্নের মধ্যে যে দ্রব্যগুণ আছে তা শরীরের ত্বকের সাথে ঘর্ষণে এবং স্পর্শে শরীরের বিভিন্ন অংশে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধীরে ধীরে রত্নটি কাজ করতে শুরু করে।একটি নির্দিষ্ট রত্ন ধারণ করার পর তা চারিদিকে তরঙ্গ তৈরি হয়,যিনি রত্নটি ধারণ করেছেন তার দেহের চারিদিকে তরঙ্গ তৈরি হয়,যে রত্ন ধারণ করেছে তার এই রত্ন থেকে উৎপন্ন তরঙ্গ দিয়ে আরোগ্য লাভ হয় ও গ্রহের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

প্রতিটি গ্রহই আমাদের শরীরকে এবং মানসিকতাকে পরিচালিত করে।যেমন সূর্য আমাদের আত্মার প্রভাব বিস্তার করে।চন্দ্র মনের উপর,মঙ্গল মানসিক শক্তি,বুধ গলার স্বর,বৃহস্পতি স্বাধীনতা এবং শেখা,শুক্র ভালবাসা,শনি গাম্ভীর্য এইভাবে আমাদের উপর গ্রহরা প্রভাব বিস্তার করছে।

By-গৌতম শীল

2 thoughts on “রত্ন সম্পর্কে জানুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *